রবিবারের সকাল
সকাল মোবাইল ফোনের ক্রমাগত ক্রন্দনে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল | ফোনটি হাতে লইয়া দেখিলাম যে
একটি বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রের অ্যাপ্লিকেশন থেকে প্রায় এগারটি নোটিফিকেশন আসিয়াছে| ভারতের মহামান্য প্রধানমন্ত্রী এই সুদূর্স্থিত আমেরিকায় আসিয়াছেন | এবং আসিয়াই তড়িৎ-গতিতে
বিভিন্ন কোম্পানির কর্তা-ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ-অধিবেশন করিতে শুরু করিয়াছেন | সংবাদমাধ্যম চিটাগুড়ের সহিত পিপীলিকা যেমন লাগিয়া থাকে, ঠিক সেইভাবেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে সর্বক্ষণ
লাগিয়া আছে এবং মিনিটে মিনিটে তিনি কি খাইলেন, কাহার সহিত হাত মিলাইলেন, কি বলিলেন,
অম্লশূলে ভুগিতেছেন কিনা, ইত্যাদি খবর পরিবেশন করিতেছে | বুভুক্ষু জনতা গোগ্রাসে তা
গিলিতেছে এবং দেশভক্তির পরিতৃপ্ত ঢেঁকুর তুলিতেছে| কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে প্রধানমন্ত্রী
মহাশয়ের উপর কিঞ্চিৎ রাগ হইলো | কিন্তু একই সাথে গর্বিত বোধ করিলাম | যদিও গর্বিত বোধ
করিবার সঠিক যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজিয়া পাইলাম না | তবে মনে হইলো গর্বিত হওয়া উচিত ।
কিছুক্ষণ পর দেখিলাম
যে বদন-পুস্তিকার কর্ণধার শ্রী মার্ক জুকার্বার্গের সহিত প্রধানমন্ত্রী একটি প্রশ্নোত্তর
আসর বসাইবেন এবং তার প্রস্তুতি স্বরূপ শ্রী জুকারবার্গ তার প্রোফাইল ছবিটি একটি তেরঙা
আস্তরণে মুড়িয়া দিয়াছেন | দেখিয়া আবার একটু গর্ব গর্ব পাইল | ডিম পাউরুটি খাইতে খাইতে
প্রশ্নোত্তর আসরটির সরাসরি সম্প্রচার দেখিতে আরম্ভ করিলাম | দেখিলাম যে পৃথিবীর বৃহত্তম
গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী কি সুন্দর বলিউডি গানের তালে তালে শাহরুখ খানের মত হাত নাড়িতে
নাড়িতে ঢুকিলেন |
তারপর শুরু হইলো
কথোপকথন | শ্রী জুকারবার্গ লাজুক মুখে কহিলেন যে তিনি ভারতে আসিয়া মোক্ষ লাভ করিয়াছিলেন
| বোধিবৃক্ষের তলে কিনা সেটা ঠিক বোঝা গেলনা | দেখিলাম প্রধানমন্ত্রী মহাশয় শ্রী জুকার্বার্গকে
(পুত্রস্নেহেই হবে) "মার্ক" বলিয়া ডাকিলেন | মনে পড়িল তিনি আমেরিকার মহামান্য
রাষ্ট্রপতি শ্রী ওবামাকেও (মিত্র-স্নেহেই হবে)
"বারাক" বলিয়াই সম্বোধন করিয়া থাকেন | এই সাহসিকতা দেখিয়া জামার কলার তুলিয়া
দ্বিগুণ উৎসাহে পাউরুটি চিবাইতে আরম্ভ করিলাম |
প্রধানমন্ত্রী
দেখিলাম শ্রী জুকার্বার্গের মোক্ষলাভের ঘটনাটিকে অপচয় যাইতে দিলেন না | মোটামুটি বিশ্ববাসীদের
জানাইয়া দিলেন যে ভারতে আসিলেই সকল মনস্কামনা পূরণ হইবে | একটি আই.সী.ইউ রুগী ও তার
ডাক্তারের উদাহরণ পেশ করিলেন যা ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না | ভারতবর্ষকে
ডাক্তার ও বাকি গোটা বিশ্বকে রুগী বলিলেন বোধ হয় |
শ্রী জুকারবার্গ
কহিলেন যে প্রধানমন্ত্রী মহাশয়ের জন্য প্রায় চল্লিশ হাজার প্রশ্ন জমা পড়িয়াছে | অবাক
হইয়া দেখিলাম যে সেইখান থেকে শুধুমাত্র চার-পাঁচটি প্রশ্ন করা হইলো মাত্র | সময়ের অভাবেই
হইবে কারণ প্রধানমন্ত্রী মহাশয় দেখিলাম সকল প্রশ্নের অত্যন্ত বিস্তৃত উত্তর দিলেন
| প্রথমে ভাবিলাম সময় অপচয়ের চেষ্টা করিতেছেন | ধৃষ্টতা করিতেছি বুঝিতে পারিয়া নিজেই
নিজেকে শাসন করিলাম |
কথোপকথন চলিতে
থাকিল | মন্ত্রী মহাশয় অনেক রকম প্রকল্প করিবেন বলিলেন | যেমন ভারতবর্ষের সকল গ্রামগুলিকে
অপটিক্যাল ফাইবার দিয়া জুড়িয়া দিবেন | বিদ্যুতের অভাবে গ্রামবাসীরা অপটিক্যাল ফাইবার
দিয়া ঠিক কি কার্যসিদ্ধি করিবেন বুঝিলাম না | তবে ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে অত বড় প্রকল্প
না বুঝিবারই কথা |
তারপর মন্ত্রী
মহাশয় বলিলেন যে তার সরকার ক্ষমতাসীন হইবার একশত দিনের মধ্যে আঠারো কোটি ব্যাঙ্ক একাউন্ট
খুলাইয়া দিয়াছেন | নিন্দুকেরা অবশ্য বলিয়া থাকেন যে এই একাউন্টগুলির বেশির ভাগেই নাকি
কোনো টাকা জমা পরে নাই | তবে পাগলে কি না বলে | গরিবগুর্বোদের কাছে একটি ব্যাঙ্ক একাউন্ট
যে স্ট্যাটাস সিম্বল, সেটা বোঝে কোন শালা |
মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া
মন্ত্রিবাণী শুনিয়া চলিলাম | এক জায়গায় উনি বলিলেন যে ভারতবর্ষে নাকি বিভিন্ন রাজ্যের
মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হইয়াছে যে কে কত সহজে নিজ রাজ্যে ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধা করিয়া
দিতে পারে| বঙ্গবাসী হওয়ার সুবাদে ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করিয়া উঠিতে পারিলাম না |
আমাদের রাজ্য কোনকালেই প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নহে, আমরা চিরকালই উদার | তবে ঠিক বলা
যায় না | হয়ত পরিস্থিতি বদলাইয়াছে | বেশ কিছুকাল দেশছাড়া | কতটুকুই বা জানি |
আকস্মিক কথা বলিতে
বলিতে মন্ত্রী মহাশয় বলিয়া বসিলেন যে ভারতবর্ষে ব্যবসা করিবার খরচ কম | উদাহরণ স্বরূপ
বলিলেন যে বদন-পুস্তিকাকে যদি আমেরিকায় এক কোটি খরচা করিতে হয় তাহলে ভারতবর্ষে সেই
কাজটি দশ লক্ষে করা সম্ভব এবং তাই যদি হয় তবে বদন-পুস্তিকা ভারতে আসিবে কি না? জনতার
দিকে তিনি প্রশ্নটি নিক্ষেপ করিলেন | উপলব্ধি করিলাম যে জনতা উত্তর দিতে বিশেষ উৎসাহ
দেখাইল না | বোধ হয় নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভাবিয়া একটু শঙ্কিত হইয়া উঠিল | শ্রী জুকারবার্গ
যদি মন্ত্রী মহাশয়ের কথায় সব কাজ ভারতে চালান করিয়া দ্যান তবে যেই ভারতীয়জাত মার্কিন
মুলুক বাসীরা এতক্ষণ প্রধানমন্ত্রীর জন্য গলা ফাটাইয়াছিলেন, তাহাদের কি হইবে?
এরপর এক দিল্লি
বাসী মহিলা বিশুদ্ধ হিন্দি ভাষায় একটি প্রশ্ন করিলেন | তিনি দিল্লি থেকে এত দুরে আসিয়াছেন
শুধু একটি প্রশ্ন করিবার জন্য, ভাবিয়া অবাক হইয়া গেলাম | তার প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী
মহাশয় বলিলেন যে একমাত্র ভারতবর্ষেই দেবীদের পূজা করা হইয়া থাকে | নিজ জ্ঞানের প্রতি
একটু সন্দেহ জাগিল| মিশরের এবং গ্রিক পুরাণে বেশ কিছু দেবীদের ব্যাপারে শুনিয়াছিলাম
| তবে প্রধানমন্ত্রী মহাশয় যখন বলিতেছেন তখন ঠিকই বলিতেছেন মনে হল |
অবশেষে মন্ত্রী
মহাশয় কে শ্রী জুকারবার্গ তাহার মাতার সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করিয়া বসিলেন | দেখিলাম
যে মন্ত্রী মহাশয় নিজের মাতার ব্যাপারে বলিতে বলিতে আবেগে বশীভূত হইয়া ভেউ ভেউ করিয়া
কাঁদিয়া ফেলিলেন (অবশ্য সকলকে মনে করাইতে ভুলিলেন না যে তিনি এক সময়ে চা বিক্রি করিতেন)| দেখিয়া আমিও কাঁদিলাম | সংহতি বজায় রাখা উচিৎ | কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি আবার
পূর্বাবস্থায় ফিরিয়া গেলেন |
প্রশ্নোত্তর সভা
শেষ হইলো | দেখিলাম বদন-পুস্তিকায় প্রচুর লোকজন শ্রী জুকার্বার্গের অনুসরণ করিয়া নিজ
প্রোফাইল ছবিটি তেরঙা আস্তরণে মুড়িয়া দিয়াছে | দেখিয়া আবার গর্বিত বোধ করিলাম এবং ঊর্ধ্ববাহু
নৃত্য আরম্ভ করিলাম | ডিম
পাউরুটি ততক্ষণে শেষ হইয়া গিয়াছে |